Home / ফিচার / ১০৮ বছরে গৌরীপুর আর.কে সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়

১০৮ বছরে গৌরীপুর আর.কে সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়

ads


ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ গৌরীপুর আর.কে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ১০৮তম বর্ষে পা রাখলো। তৎকালীন জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী তাঁর পিতা রাজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর নামে ১৯১১ সনে ৬ হাজার ১৮ বর্গফুট আয়তনে এ বিদ্যালয়টি স্থাপন করেন।

এ বছরও এসএসসি পরীক্ষায় উপজেলা জিপিএ-৫ ও পাসের হারে প্রথমস্থান অর্জন ও জাতীয় পর্যায়ে আবারও দু’জন স্কাউট প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। শিক্ষককে সংকটে বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিভাবকদের অভিযোগ।

১৯২০সনে ৯৩৬নং দলিল মূলে এ বিদ্যালয়টির নামে প্রায় ১১একর জমি নিষ্কর ও ক্ষতিপূরণ অযোগ্য ঘোষণায় দলিল সম্পাদন করে দেন। বিদ্যালয়টি ১৯৯১সনে জাতীয়করণ করার পর বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি বিদ্যালয়ের সমুদয় ভূমি সরকারের নামে ৯৭৪২নং দলিলে লিখে দেন। তবে এ বিদ্যালয়ের কিছু জমি এখনও ভূমিদস্যুদের দখলে। বিজ্ঞ আদালতের রায় পেলেও বিদ্যালয় পাচ্ছে না জমির দখল।

অপরদিকে ভূমি জরীপকারীদের খামখেয়ালীপনায় বিদ্যালয়ের কিছু জমি সরকারের ১নং খাস খতিয়ানে লিপিবদ্ধ হওয়ায় জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। ১৫ শতাংশ ভূমির লীজ বাতিল করতে আন্দোলনে নামতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। সৃষ্ট জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি হয়নি আজও। বিদ্যালয়ের রেকর্ডকৃত জমির খাজনাও নিচ্ছেন না স্থানীয় ভূমি অফিস।

বিদ্যালয়টিতে বর্তমান ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৬৭৪জন। তাদের মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ৩৭জন। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিদ্যালয়টিতে ২০১৪সাল থেকে আবারও ছাত্রী ভর্তি বন্ধ রয়েছে। বিদ্যালয়টি শিক্ষকের পদ সংখ্যা ১৭জন। শূন্য পদের সংখ্যা ২টি। প্রেষণে রয়েছেন ৪জন সহকারী শিক্ষক।

বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সমন্বয় নেই গণিত, ভৌত বিজ্ঞান, ইংরেজী ও ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষকের সংকট থাকায় ছাত্রছাত্রীদের পাঠদান কার্যক্রম বিঘœ ঘটচ্ছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানান, শিক্ষক সংকেটের বিষয়টি উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানো হয়েছে। জমিসংক্রান্ত জটিলতারও নিষ্পত্তি হয়নি।

প্রতিবছরের ন্যায় এবারও এসএসসি পরীক্ষায় উপজেলা জিপিএ-৫ ও পাসের হারে প্রথমস্থান অর্জন করেছে। জাতীয় পর্যায়ে ২০১৮সালে স্কাউট প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে এস.এম নাজমুল হক ও মেহেদী হাসান সোহান। অপরদিকে ২০১৭সালে মোহাম্মদ আমির হামযা ও মোঃ পিয়াস আহাম্মেদও স্কাউট পদক অর্জন করেন।

তাদেরকে ২০১৭ সালের ১৩জুলাই ব্যাজ পরিয়ে দেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ ২০১৮ উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সহকারী শিক্ষক মোঃ আব্দুল মালেক শ্রেষ্ঠ শ্রেণি শিক্ষক নির্বাচিত হন। শ্রেষ্ঠ ছাত্র নির্বাচিত হন সৈয়দ রুমান।

ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন, ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯’র গণঅভ্যূত্থান, ১৯৭১’র মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে এই প্রতিষ্ঠানের শিার্থীদের রয়েছে গৌররোজ্জ্বল অবদান। মেধাবী শিার্থীরাও ছড়িয়ে আছেন এবং ছিলেন উপমহাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। চোখ জোড়ানো নয়নাভিরাম সুনিপূর্ণ কারুকার্যে নির্মিত শতবর্ষী ইংরেজী ই অরের ভবনটি অনন্যাস্থাপত্য শৈলী।

বিখ্যাত আর্কিটেক ও চীনা কারিগর দিয়ে নির্মিত এ ভবনটি দেখতে অনেকটা ইংরেজী (ই) অরের মতো। কাঠের ফ্রেমের উপর ইট, চুন-সুরকীর মিশ্রণে ১৫ইঞ্চির গাঁথানি দিয়ে নির্মিত লাল রং করা বিদ্যালয়টিতে সর্বমোট ১৩টি ক রয়েছে। সংস্কার ও মেরামতের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ৬টি কক্ষ ইতোমধ্যে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা অবৈতনিক প্রধান শিক ছিলেন বাবু জ্ঞানেন্দ্র নাথ মূখার্জি।

১৯১৯সনে সর্বভারতীয় সরকারি বৃত্তিপ্রাপ্ত কৃতি ছাত্র মোঃ আকবর আলী তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের প্রাদেশিক আইন পরিষদের পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী ছিলেন। প্রাদেশিক সরকারের অর্থ মন্ত্রী ফখরউদ্দিন আহমেদ, তৎকালীন প্রাদেশিক সরকারের কৃষি মন্ত্রী পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বস্ত্র মন্ত্রী হাসিম উদ্দিন আহমেদ, প্রাদেশিক পরিষদের এম.পি.এ আব্দুল হামিদ,

সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ. এফ. এম. আহসান উদ্দিন চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মোঃ হাতেম আলী এম.সি.এ, বিশিষ্ট নাট্যকার ও সাহিত্যিক আশকার ইবনে শাইখ অত্র বিদ্যালয়ে জ্ঞানর্জন করেন। নেত্রকোনা থেকে ইংরেজ হঠাও আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা মুখ্যলাল দাসও এবিদ্যালয়ের ছাত্র।

সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ এমপি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের শিা বিভাগের বাংলাদেশ প্রধান সুব্রত শংকর ধর, বিশিষ্ট চু বিশেষজ্ঞ ডাঃ এ.কে.এম.এ.মুক্তাদির, জাতীয় চু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রজেক্ট ডিরেক্টর ডা: মো: শাহাবুদ্দিন, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাহ আলমগীর, বাংলাদেশ আনবিক শক্তি কমিশনের প্রধান ড. আমির হোসেনও এই বিদ্যালয়ের এক সময়ের কৃতি ছাত্র ছিলেন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃস্থানীয় খালেদুজ্জামান, ডা: আব্দুস সোবহান, তফাজ্জল হোসেন চুন্নু, রফিকুল ইসলাম, ফজলুল হক, মো: আবুল হাসিম চেয়ারম্যান, আব্দুল হাকিম, মো: ইদ্রিস আলী, মো: বোরহান তালুকদার, আশুতোষ রায়, আ: হান্নান, আবুল খায়ের, মো: সিরাজ বক্স, কনু মিয়া, জসিম উদ্দিনসহ অনেকেই এ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।

১৯৬৯’র গণঅভ্যত্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত আজিজুল হক হারুণের মিছিলেও ছিল আরকে উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। গৌরীপুর বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় কর্মরত ৩৪জনের মধ্যে ২৮জন প্রতিনিধিই এই বিদ্যালয়ের ছাত্র।

জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী তাঁর পিতা-রাজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর নামের রাজেন্দ্র-এর ইংরেজী আদ্যর ‘আর’ ও কিশোর- এর আদ্যর ‘কে’ এর সমন্বয়ে বিদ্যালয়টি আর, কে, উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিতি লাভ করে। জনশ্রুত আছে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর এস্টেট ম্যানেজার বাণী কন্ঠ নিয়োগী এবং দেওয়ান নলিনী রায়-এর পরামর্শ নিয়েছিলেন।

বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা রাজা ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন রাজা রাজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর দত্তক পুত্র। শিা ও সঙ্গীতানুরাগী জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী তাঁর প্রজা সাধারণের মাঝে শিার আলো ছড়িয়ে দিতে অত্র বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলা ঈশ্বরগঞ্জে তাঁর স্ত্রী রাণী বিশেশ্বরী দেবীর নামে বিশেশ্বরী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় নামে আরও একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। /সূত্র: ডেইলি বাহাদুর, ছবি: অনলাইন মাধ্যম

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: